শনিবার, ২৬ অক্টোবর, ২০১৩

ট্রাফিক


আমি যখন ক্লাস এইটে পড়ি, আমার খালাতো বোন তমা'র বয়স তখন আড়াই। আমরা থাকতাম গ্রীন রোডে, ওরা থাকতো মোহাম্মদপুর। ছোটবেলায় তমা একটা মহা-নাদুস-নুদুস-হাসিখুশি বাচ্চা ছিল এবং ও যতক্ষণ আমাদের বাসায় থাকত, আমাদের সবার সময়টা খুব সুন্দর কেটে যেত। তাই প্রায়ই আমি স্কুল থেকে রিক্সা নিয়ে একা একা খালার বাসায় চলে যেতাম, তারপর তমা'কে প্যাকেট বানিয়ে রিক্সায় করে বাসায় নিয়ে আসতাম। চিন্তা করে দেখেন তো একবার, ক্লাস এইটের একটা ছেলের একা একা রিক্সা করে মোহাম্মদপুর থেকে আড়াই বছরের পিচ্চি বোনকে নিয়ে গ্রীন রোডে চলে আসার ব্যাপারটা এখনকার ঢাকা শহরের সাথে মিলাতে পারেন কিনা। 

সেই ঢাকার ছবি এখন কল্পনাতেও আসেনা। প্রবলেমটা কি জানেন? যদি এখন থেকেই আমি, আপনি, আমরা নিজেরা কিছু না করি, তাহলে আর থেকে ১০ বছর পর এই আজকের ঢাকা শহরটাকে নিয়েও আমরা একইভাবে হা-পিত্যেশ করবো। আজ রাতের #আমরাই_বাংলাদেশ এ আমার সাথে দেখতে পাবেন তিনজন প্রানোচ্ছল তরুনকে, যারা তাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে শহরটাকে কিছু ফেরত দেয়ার চেষ্টা করছে। আমরা যারা ট্রাফিক নিয়ে শুধু অভিযোগই করতে থাকি, তাদের চোখ খুলে দেয়ার মত অনেক কিছুই বলবে ওরা। 

এল-ক্লাসিকো'র এই রাতে আমরাই বাংলাদেশ দেখার দুঃসাহসিক অনুরোধটা ঠিক কিভাবে করব, বুঝে উঠতে পারছি না। 

শুক্রবার, ১১ অক্টোবর, ২০১৩

পাছু

বাংলাদেশের খেলার ফাঁকে ফাঁকে একটা বিজ্ঞাপন দেখায়। এক ছেলে ক্রিকেট খেলতে গিয়ে পাশের বাসার জানালার কাঁচ ভেঙ্গে ফেলে। আঙ্কেল স্কেল নিয়ে এসে হাত পাততে বললে ছেলেটা এক হাতের বদলে দুই হাত বাড়িয়ে দেয়; তারপর "কনফিডেন্টলি" আঙ্কেলকে ফাপড় দেয়। আঙ্কেল ফাপড় খেয়ে খুশি হয়ে যায় (!!!) এবং ছেলেটিকে বল ফেরত দিয়ে দেয়। গুনী ছেলে কলার উঁচিয়ে আবার খেলতে চলে যায়। 

এইবার এই গল্পের ল্যাবরেটরিয়ান ভার্সনটা শোনেন। (আমার মনে হয় সরকারী বাংলা মেডিয়াম যেকোনো স্কুলের স্টুডেন্টদের জন্যই এই ভার্সনটা কমন পড়তে পারে)

ক্লাস নাইন'এর রাজীব ক্রিকেট খেলতে গিয়ে ক্লাসরুমের জানালার কাঁচ ভেঙ্গে ফেলে। খায়ের স্যার/আনোয়ারুল করিম স্যার/মহসীন স্যার/জ্বিনের বাদশাহ স্যার/(ইন ফ্যাক্ট যে কোনো স্যার) বেত নিয়ে এসে হাত পাততে বললে রাজীব এক হাতের বদলে দুই হাত বাড়িয়ে দেয়; তারপর "কনফিডেন্টলি" স্যার'কে বলে "মারলে এক হাতে কেন? দুই হাতেই মারুন স্যার। কারণ পরের বল'টাও ছক্কাই হবে।" 

রাজীব স্কুল শেষে বাসায় ফিরল; হাতে কোনো বেতের বাড়ির চিহ্ন নাই, গালেও নাই চটকানার দাগ। বেচারা শুধু ৭ দিন চেয়ারে (গদি-ওয়ালা এবং গদি-ছাড়া, বোথ) বসতে পারলো না। 

ভাগ্যিস স্যার, আপনারা ছিলেন। পাছু লাল করে হলেও, আমাদের মত বেয়াড়াগুলিকে ঠিকই মানুষ বানিয়ে ছেড়েছেন। 

তুই আবার মাইন্ড করিস না ভাই। 

বুধবার, ৯ অক্টোবর, ২০১৩

পাথর-বৃষ্টি


আজ আকাশ থেকে পাথর-বৃষ্টি হতে পারে। সেই পাথরের আঘাতে আমার মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যেতে পারে। 
আজ বৃহস্পতিবার হলেও শনির বলয় যেকোনো সময় আইৎকা এটাক করতে পারে। 
আজ পান থেকে চুন খসলেই বেঁধে যেতে পারে তুলকালাম কান্ড। 
আজ ব্রাশ করার পর টুথব্রাশটা ঠিক জায়গায় না রাখা হলে বেধে যেতে পারে ট্যারম ট্যারম  যুদ্ধ। 
মেয়ে যদি স্কুল থেকে ফিরে দু'পায়ের মোজা ড্রয়িং রুমের সোফায় ছুড়ে ফেলে, বলা যায় না কালকে আমার  মেয়ের ন্যাড়া মাথা দেখলেও অবাক হব না। 
পুত্র আমার মনের ভুলে যদি হাগু-সূত্র মেনে না চলে, বেচারার কপালে হয়ত আজ খাওয়া নাও জুটতে পারে। 
আমার পকেটে একটা লিস্ট আছে - "আজকের করনীয়"; একটাও যদি কোনভাবে মিস হয়ে যায়, মিসাইল ইজ ওয়েইটিং ফর মি। 
.
.
.
.
.
.
.
আজ সকালে রাগারাগি করে আমার বউ দুইটা বুয়া'কেই বিদায় করে দিয়েছে। বর্তমানে বউ আমার পুত্রকে নিয়ে বাসায় অবস্থান করছেন, বুয়াহীন অবস্থায়। মেজাজ ফট্টিনাইন।  কন্যা স্কুলে। আমি অফিসে। ইয়া নফসি ইয়া নফসি করছি। ফোন আসলেই কেঁপে কেঁপে উঠছি। 

মঙ্গলবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৩

সেবা প্রকাশনী

আমাদের দেশে 
১। ৩ গোয়েন্দার মত আরেকটা সিরিজ আবার কবে হবে? 
২। নিয়মিত কে আবার আমাদের বিদেশী ক্লাসিকগুলি অনুবাদ করে পড়তে দিবে?
৩। রহস্য পত্রিকার মত আরেকটা পত্রিকা আবার কবে বের হবে? 
৪। আরেকটা মাসুদ রানা কবে হবে?

আমাদের ভালমত বেড়ে ওঠার পেছনে একটা সেবা প্রকাশনীর ভূমিকা যে কতখানি ছিল, এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। রবিন হুড, থ্রি মাস্কেটিয়ারস, কাউন্ট অফ মন্টিক্রিস্তো সব তো সেবা প্রকাশনীই মাথায় ঢুকিয়েছে। আমাদের ছেলে-মেয়েরা পড়বে কি? শুধুই হ্যারি পটার? লর্ড অফ দা রিংস? বাংলা বই কই? সবাই কি ইংলিশ মিডিয়ামে পরে নাকি? অনুবাদ যেগুলো হচ্ছে, যাচ্ছেতাই সব ভাষা। বাচ্চারা তাহলে শিখবে কোত্থেকে? ডোরেমন, নিনজা হাতরির পিন্ডি চটকে লাভ আছে? ওদের কোন অল্টারনেটিভটা  দিচ্ছি আমরা বড়রা? জাফর ইকবাল, শাহরিয়ার কবির'দের পর আর কে? সেবা প্রকাশনীর মত আরেকটা প্রকাশনী কবে হবে আবার? 

কি করা যায় বলুন তো? আমি তো কোনো সমাধান খুঁজে পাচ্ছি না। 

শুক্রবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৩

ফ্রেন্ডলি আমরা

১।
ক্লাস ফাইভ কি সিক্স'এ থাকতে প্রথম কোলকাতা যাই। আম্মার সাথে নিউ মার্কেট যাব। ট্যাক্সি-ওয়ালা আম্মাকে বলে - কোন গেটে "নামবে" দিদি? "নামবে"???!!! তুই ব্যাটা ট্যাক্সিওয়ালা আমার আম্মারে তুমি-তুমি করে বলস ক্যান? বাচ্চা মানুষ, কিছু বললাম না, চুপ থাকলাম। 

শাড়ির দোকানে গেলাম। দোকানদার বলে - এটা নতুন এসেচে দিদি। এটা নিয়ে "নাও"। "তোমাকে" বেশ মানাবে। ... আরে!!! কি যন্ত্রণা!!! এই ব্যাটাও দেখি আম্মাকে তুমি-তুমি করে বলে! বাচ্চা মানুষ, তাই এবারো চুপ করে থাকলাম। হোটেলে ফেরার পর আম্মা'কে বললাম, আম্মা, কোলকাতার মানুষগুলা সব এত বেয়াবদ ক্যান? মুরুব্বি'রে সম্মান দেখানোর কোনো বালাই নাই। তোমারে বলে "তুমি তুমি" করে!!!  

আম্মা বুঝলো - বাবা, ওরা বেয়াদব না। ওরা আসলে অনেক "ফ্রেন্ডলি"!

২।
বড় হওয়ার পর আবার গেলাম কোলকাতায়। বড় মানে, বয়স যখন ৩০'এর মত, তখন; একটা অ্যাওয়ার্ড নিতে। যাওয়ার পর কলকতার বিজ্ঞাপনী সংস্থার কিছু "সদ্য তারুন্যে পৌঁছানো" মেয়ের সাথে খাতির হয়। আমি ঢাকা থেকে গেছি শুনে তাদের ম্যালা আগ্রহ। রাজীব'দা রাজীব'দা আজকে সন্ধ্যায় ফ্রি "আছ" তো? "তোমাকে" নিয়ে একটা জোশ রেস্টুরেন্টে যাব। তারপর "তোমাদের" ওখানকার গল্প শুনব। 

দেশে ফিরে আমার মুখে এই গল্প শুনে বউ তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলো - "তুমি" মানে??? ওরা তোমাকে "তুমি তুমি" করে বলসে নাকি? মহা বেয়াদব তো ওখানকার মেয়েরা! 

আমি বোঝালাম - আহা! বেয়াদব কেন হবে! ওরা আসলে একটু বেশি "ফ্রেন্ডলি"!

৩। 
গ্রামীনফোনের ট্যাগলাইন ছিল "কাছে থাকুন"; বদলে হলো "চল বহুদূর"!
রবি বলত "জ্বলে উঠুন আপন শক্তিতে", তারপর হঠাত "ছোট্ট একটা কাজ, করে দেখাও আজ"!
প্রথম আলো - "বদলে যাও, বদলে দাও"!
আজ দেখলাম বাংলালিংক বলা শুরু করলো "নতুন কিছু করো"!

আপনি থেকে তুমি'তে নেমে এসে আমরা কিন্তু মোটেও বেয়াদব হয়ে যাচ্ছি না। আমরা আসলে "ফ্রেন্ডলি" হয়ে যাচ্ছি। 

ভালো তো! ভালো না?